জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর আপৎকালীন এ সম্পদের দাম কমে আউন্সপ্রতি প্রায় ৪ হাজার ডলারে নেমে আসে। টানা দুই মাস ধরে স্বর্ণের দর এ সীমার মধ্যেই থমকে আছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন দেশের বিশাল সরকারি ঋণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক স্বর্ণ কেনার পরও বাজারের এ মন্দা ভাব কাটছে না। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূলত স্বল্পমেয়াদি কিছু অর্থনৈতিক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণেই এ স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণসহ অন্য ধাতুর দাম সুদের হার, মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপর নির্ভর করে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) এ বছর সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ফলে বাজারে বন্ডের প্রকৃত আয় বা ‘রিয়াল বন্ড ইল্ড’ বেড়েছে। স্বর্ণে বিনিয়োগ করলে সরাসরি কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের আকর্ষণ কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার শক্তিশালী হওয়ায় অন্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, যা নতুন চাহিদা তৈরিতে বাধা দিচ্ছে।
এছাড়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছুটা শিথিলতাও স্বর্ণের দাম কমার একটি বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের পর আপৎকালীন বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের অতিরিক্ত চাহিদা কমে আসে। পরবর্তী সময়ে নতুন করে সংঘাত দেখা দিলেও বাজারে স্বর্ণের সে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়নি। অন্যদিকে টানা ১৮ মাস ধরে দাম বাড়ার পর বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেন। এ প্রবণতাও স্বর্ণের দামকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রেখেছে।
তবে স্বল্পমেয়াদি এ মন্দা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের বাজার শক্তিশালী থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং সরকারি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এতে ডলারের ওপর ঝুঁকি বাড়ায় বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন নিজেদের রিজার্ভে ডলারের বদলে স্বর্ণ কেনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
২০২২ সাল থেকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ কিনছে। এটি সাময়িক কোনো বিনিয়োগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার অংশ। নতুন খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বাজারে এর সরবরাহ এমনিতেই সীমিত। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা বাড়ায় ভবিষ্যতে স্বর্ণের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেজ্ঞরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এ দরপতন কোনো বড় মন্দার সংকেত নয়, বরং এটি একটি সাময়িক মূল্য সমন্বয়। বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে এখন কেবল মূল্যস্ফীতি প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং সরকারের অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় বড় সুরক্ষা কবচ হিসেবেই বিবেচনা করছেন।